ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬ | ৪:৩৪ এএম
বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের নকশায় বড় পরিবর্তনের দ্বার খুলতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জেটজিরো। প্রচলিত যাত্রীবাহী বিমানের কাঠামো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন নকশার একটি উড়োজাহাজ তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি, যা ভবিষ্যতে বোয়িং ও এয়ারবাসের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের মোহাভে মরুভূমির একটি বিশাল হ্যাঙ্গারে বর্তমানে ২০০ আসনের বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন পরীক্ষামূলক উড়োজাহাজটির নির্মাণকাজ চলছে। এটি সফলভাবে আকাশে উড়তে পারলে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ হবে, যেখানে বিমানের মূল কাঠামো ও ডানা একীভূত নকশায় তৈরি করা হয়েছে।
মান্টা রে মাছের আকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত এই নকশার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো জ্বালানি সাশ্রয়। জেটজিরোর দাবি, প্রচলিত যাত্রীবাহী বিমানের তুলনায় নতুন উড়োজাহাজটি প্রায় ৫০ শতাংশ কম জ্বালানি ব্যবহার করবে। এতে বিমান পরিচালনার ব্যয় যেমন কমবে, তেমনি কার্বন নিঃসরণও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
প্রকল্পটিতে ইতোমধ্যে বিনিয়োগ ও আগ্রহ দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ও অ্যালাস্কা এয়ারলাইন্স। এছাড়া মার্কিন বিমানবাহিনীর আর্থিক সহায়তায় এবং নর্থ্রপ গ্রুম্যানের সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্কেলড কম্পোজিটসের মাধ্যমে উড়োজাহাজটি তৈরি করা হচ্ছে। পরীক্ষামূলক মডেলে ব্যবহার করা হচ্ছে বোয়িং ৭৫৭ উড়োজাহাজে ব্যবহৃত প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনির ইঞ্জিন।
জেটজিরোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টম ও’লিয়ারি জানান, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এই ধরনের নকশা নিয়ে গবেষণা করেছে। সেই গবেষণার ফলকে কাজে লাগিয়েই তারা বাস্তবে নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ নির্মাণ করছেন। তার মতে, ভবিষ্যতে একই নকশা সামরিক পরিবহন ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ তৈরিতেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির জেড-৪ মডেলটি ২০০ থেকে ২৭০ আসনের মাঝারি ও দীর্ঘ দূরত্বের রুটের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে প্রচলিত গোলাকার কেবিনের পরিবর্তে থাকবে প্রশস্ত ও সমতল অভ্যন্তরীণ কাঠামো, বড় জানালা এবং যাত্রীদের জন্য আরও আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা। এছাড়া ইঞ্জিনগুলো পেছনের উঁচু অংশে স্থাপন করায় রানওয়ে ও আশপাশের এলাকায় শব্দদূষণও কম হবে।
তবে এই প্রযুক্তির সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিমান খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন নতুন নকশার উড়োজাহাজকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুযায়ী অনুমোদন পেতে দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা, বিপুল বিনিয়োগ এবং বহু বছরের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
২০২০ সালে প্রতিষ্ঠার পর জেটজিরোর এই প্রকল্প নিয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তবে ২০২৩ সালে মার্কিন বিমানবাহিনীর ২৩৫ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি পাওয়ার পর প্রকল্পটি নতুন গতি পায়। এরপর ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি আরও ১৭৫ মিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহ করে। একই সময়ে ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ভবিষ্যতে ১০০টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনার কথাও জানায়।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন করা। সেই পরীক্ষা সফল হলে ২০৩০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনার গ্রিন্সবোরোতে বাণিজ্যিকভাবে উড়োজাহাজটির উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
টম ও’লিয়ারির ভাষায়, প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়নই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সেটি সফল হলে প্রমাণ হবে, এটি কেবল একটি ধারণা নয়, বরং ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে নতুন যুগের সূচনা করতে সক্ষম একটি বাস্তব প্রযুক্তি।
© 2026 Aviation Times 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত