নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ অগাস্ট ২০২৬ | ৫:১৮ এএম
রাজধানীর কুর্মিটোলায় ১৯৮০ সালে যাত্রা শুরু করা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের প্রধান ও বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রতিষ্ঠার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও ভৌগোলিক অবস্থান ও সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে এটিকে এখনো আঞ্চলিক কার্গো হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, লজিস্টিক সুবিধা এবং ট্রান্সফার কার্গো পরিচালনার সক্ষমতার অভাবেই দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে আছে শাহজালাল। অথচ বিদ্যমান রপ্তানি কার্গো ভিলেজের গুদামকে উপযুক্তভাবে রূপান্তর করা গেলে শুরুতেই প্রতিদিন ১০০ মেট্রিক টন ট্রান্সফার কার্গো পরিচালনা করা সম্ভব। এতে বছরে প্রায় ৯ দশমিক ১২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১২১ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্গো পরিদপ্তরের উদ্যোগে গত ১৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত এক সভায় এ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়। সভায় বলা হয়, শাহজালালকে কার্গো হাব হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে এর সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। ফলে রাজস্ব আয়ের পরিমাণও কয়েক গুণ বাড়তে পারে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাইজার সোহেল আহমেদ বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানসহ বিভিন্ন দিক থেকে শাহজালাল কার্গো হাবের জন্য উপযোগী। কিন্তু দীর্ঘদিনেও বিমানবন্দরটি ট্রান্সফার কার্গো বা হাব হিসেবে ব্যবহার করা যায়নি। এর অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তার ঘাটতি।
তিনি বলেন, শাহজালালকে কার্গো হাবে রূপান্তরের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বিমানের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মঈন উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের কাছাকাছি হংকং ও দুবাইয়ের মতো বিমানবন্দর সফল কার্গো হাব হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ঢাকা এখনো সেই অবস্থানে যেতে পারেনি।
তার মতে, তৃতীয় টার্মিনালকেন্দ্রিক নতুন রপ্তানি কার্গো টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু হলে ঢাকাকে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কার্গো হাব হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। তখন ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও দূরপ্রাচ্যের মধ্যে কার্গো পরিবহনে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট কার্গো পরিবহনেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়বে।
সভায় জানানো হয়, বর্তমান রপ্তানি কার্গো ভিলেজের গুদামটি এক্সপোর্ট কার্গো টার্মিনালের সঙ্গে যৌথভাবে রপ্তানি পণ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করা হবে। কিন্তু ট্রান্সফার কার্গো পরিচালনার জন্য বর্তমান অবকাঠামো যথেষ্ট নয়।
ফলে এয়ার-টু-এয়ার ট্রান্সফার এবং ট্রানজিট কার্গোর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করতে নতুন বা উপযুক্ত অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক কার্গো স্ক্রিনিং, নিরাপত্তা ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের কার্গো রপ্তানি বাজারেও বড় সম্ভাবনা রয়েছে। সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়। এর প্রায় ১২ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৭৫ হাজার মেট্রিক টন, আকাশপথে পরিবহন করা হয়। এর বড় অংশই কার্গো বিমানের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়।
তবে বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানের বহরে কোনো কার্গো বিমান নেই। ভবিষ্যতে কার্গো বিমান যুক্ত করা গেলে এ খাতে আরও বড় পরিসরে ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শাহজালালকে কার্গো হাব হিসেবে গড়ে তুলতে শুধু টার্মিনাল ও গুদাম নির্মাণ যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা, কাস্টমস নজরদারি, আধুনিক স্ক্রিনিং এবং বিপজ্জনক পণ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। এয়ার-টু-এয়ার কার্গো পরিবহনে বিপজ্জনক পণ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সংরক্ষণাগার ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কার্গো হাবের মাধ্যমে যাতে কাস্টমস আইন ও প্রচলিত বিধিবিধানের পরিপন্থি কোনো কার্যক্রম না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
কার্গো হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকেও যুক্ত করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে সেখানে বাংলাদেশ বিমানের রেগুলেটেড এজেন্ট থার্ড কান্ট্রিজ সেবা না থাকায় শিগগিরই চট্টগ্রামকে কার্গো হাবের নেটওয়ার্কে যুক্ত করা সম্ভব হবে না।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আধুনিক অবকাঠামো, দক্ষ কার্গো ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস সুবিধা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করা গেলে শাহজালালকে আঞ্চলিক কার্গো হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এতে বাংলাদেশের পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমার পাশাপাশি বাড়বে আন্তর্জাতিক ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যবসা। একই সঙ্গে প্রতিবছর শত কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আয়ের পথও খুলতে পারে।
© 2026 Aviation Times 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত