নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ অগাস্ট ২০২৬ | ৬:৫৭ এএম
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে আকাশপথের যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দুই দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মধ্যে নতুন সমঝোতার ফলে বাংলাদেশি ও সৌদি মনোনীত এয়ারলাইনগুলো এখন সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৮৪টি যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারবে। এর আগে অনুমোদিত ফ্লাইট সংখ্যা ছিল ৪৯টি। অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় সপ্তাহে ৩৫টি অতিরিক্ত যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদর দপ্তরে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক এসব তথ্য জানান। এ সময় বেবিচকের সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন সমঝোতার সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে দুই দেশের বিপুলসংখ্যক যাত্রীর জন্য। বিশেষ করে সৌদি আরবে বসবাস ও কর্মরত প্রায় ৪০ লাখ বাংলাদেশি নিয়মিত দেশে আসা-যাওয়া করেন। ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ায় তাদের জন্য আসন পাওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং ব্যস্ত মৌসুমে টিকিটের সংকটও কিছুটা কমতে পারে।
হজ ও ওমরাহ মৌসুমে এই বাড়তি সক্ষমতার গুরুত্ব আরও বেশি। প্রতিবছর ধর্মীয় কারণে সৌদি আরবে যাতায়াতকারী বাংলাদেশি যাত্রীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তখন বিমানভাড়া ও টিকিটের চাহিদা দুটিই বাড়ে। অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ থাকায় এ সময় যাত্রী পরিবহন আরও সহজ করার পাশাপাশি আকস্মিক চাপ সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়বে।
ফ্লাইট সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে দুই দেশের এয়ারলাইনগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও বাড়তে পারে। আর প্রতিযোগিতা বাড়লে যাত্রীদের জন্য তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া ও সময়সূচির বেশি বিকল্প তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাস্তবে ভাড়া কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে এয়ারলাইনগুলোর পরিচালন ব্যয়, জ্বালানি মূল্য, চাহিদা এবং বাজার প্রতিযোগিতার ওপর।
নতুন সমঝোতায় শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দর থেকেও সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে যোগাযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে রাজধানীর বাইরে বসবাসকারী যাত্রীদের জন্যও সৌদি আরবে যাতায়াতের বিকল্প বাড়তে পারে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম আরও সক্রিয় করার সুযোগ তৈরি হবে।
যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি কার্গো খাতেও নতুন সুযোগ যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২১টি কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে। এর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য সৌদি আরবের বাজারে পণ্য পাঠানোর সক্ষমতা বাড়তে পারে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক, তাজা শাকসবজি, ফলমূল এবং দ্রুত পরিবহনের প্রয়োজন হয় এমন পণ্যের ক্ষেত্রে আকাশপথে কার্গো পরিবহনের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হলে সৌদি আরবের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য বাজারেও বাংলাদেশি পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নতুন সমঝোতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘ফিফথ ফ্রিডম ট্রাফিক রাইটস’। এর আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত ও অনুমোদন সাপেক্ষে বাংলাদেশের মনোনীত এয়ারলাইনগুলো সৌদি আরবকে মধ্যবর্তী গন্তব্য হিসেবে ব্যবহার করে তৃতীয় দেশের নির্ধারিত গন্তব্যে কার্গো পরিবহন করতে পারবে। স্পেন ও জার্মানির মতো ইউরোপীয় গন্তব্যে এ ধরনের সুযোগ বাংলাদেশের কার্গো নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
এর ফলে সৌদি আরব শুধু বাংলাদেশের জন্য একটি গন্তব্য নয়, বরং ইউরোপসহ অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে পণ্য পরিবহনের একটি সম্ভাব্য সংযোগকেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই সুবিধা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের এয়ার কার্গো খাত আন্তর্জাতিক পরিবহন নেটওয়ার্কে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
সমঝোতায় কোড-শেয়ারিংয়ের সুযোগও রাখা হয়েছে। এর ফলে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পর দুই দেশের মনোনীত এয়ারলাইনগুলো একে অপরের কিংবা তৃতীয় দেশের এয়ারলাইনগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে ফ্লাইট বাজারজাত ও পরিচালনার ব্যবস্থা করতে পারবে। এতে সরাসরি ফ্লাইটের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাত্রীদের সংযোগ সুবিধা বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে ‘কো-টার্মিনালাইজেশন’ সুবিধা থাকায় একই ফ্লাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একটি দেশের একাধিক গন্তব্যে যাত্রী পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে বিমান সংস্থাগুলো তাদের রুট পরিকল্পনা আরও নমনীয়ভাবে সাজাতে পারবে।
ব্যস্ত মৌসুমে উড়োজাহাজের সংকট মোকাবিলায় ‘ওয়েট লিজ’ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এই ব্যবস্থায় প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য এয়ারলাইন থেকে উড়োজাহাজসহ ক্রু ও পরিচালনাসংক্রান্ত সুবিধা নিয়ে অতিরিক্ত ফ্লাইট চালানো সম্ভব হয়। ফলে হজ, ওমরাহ বা ছুটির মৌসুমে হঠাৎ যাত্রীসংখ্যা বেড়ে গেলে এয়ারলাইনগুলোর জন্য সক্ষমতা বাড়ানো তুলনামূলক সহজ হবে।
বেবিচক চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন সমঝোতা কেবল দুই দেশের মধ্যে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয় নয়। এর মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন, হজ ও ওমরাহ যাতায়াত, প্রবাসী বাংলাদেশিদের যোগাযোগ, কার্গো পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং এয়ারলাইনগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হবে।
© 2026 Aviation Times 24 কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত